আয়কর স্লাব ও করমুক্ত সীমা ২০২৬-২০২৭: ব্যক্তিশ্রেণীর কর হার ও পরিগণনা নির্দেশিকা
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণীর সাধারণ করমুক্ত সীমা ৪ লাখ এবং নারীদের ৪.৫০ লাখ টাকা। ৫টি ধাপের কর হার, এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর ও প্রতিবন্ধী পোষ্য সুবিধা পরিগণনার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
- সাধারণ পুরুষ করদাতার বার্ষিক করমুক্ত আয়ের সীমা ৪,০০,০০০ টাকা।
- মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত সীমা ৪,৫০,০০০ টাকা।
- তৃতীয় লিঙ্গ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য করমুক্ত সীমা ৫,২৫,০০০ টাকা।
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আহত বীরদের করমুক্ত সীমা ৫,৫০,০০০ টাকা।
- প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্য থাকলে প্রতি সন্তানের জন্য অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি পাবে।
- সর্বোচ্চ কর হার ২৫%, যা ১৬,৫০,০০০ টাকার পরবর্তী অবশিষ্ট আয়ের ওপর প্রযোজ্য।
১. ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের ক্যাটাগরিভিত্তিক তালিকা ও বিশেষ সুবিধা
করদাতার সামাজিক প্রেক্ষাপট, বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে আয়কর আইনে বিভিন্ন শ্রেণীর করদাতার জন্য পৃথক করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিচে অনুমোদিত তালিকাটি তুলে ধরা হলো:
| করদাতার শ্রেণী বা বিশেষ মর্যাদা | করমুক্ত আয়ের সীমা (টাকা) | আইনি প্রমাণক ও বিশেষ শর্তাবলি |
|---|---|---|
| সাধারণ করদাতা (পুরুষ) | ৪,০০,০০০ টাকা | সকল সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণীর আবাসিক করদাতা |
| মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জ্যেষ্ঠ নাগরিক | ৪,৫০,০০০ টাকা | বয়স প্রমাণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্ট গ্রাহ্য |
| তৃতীয় লিঙ্গ এবং প্রতিবন্ধী করদাতা | ৫,২৫,০০০ টাকা | সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র/সনদ প্রয়োজন |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা | ৫,৫০,০০০ টাকা | মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত সরকারি গেজেট সনদ |
(সারণীটি ডানে-বামে স্ক্রল করে সম্পূর্ণ তথ্য দেখুন)
২. করযোগ্য আয়ের উপর প্রযোজ্য ৫টি প্রগ্রেসিভ কর স্লাব ও হার
করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর অবশিষ্ট করযোগ্য আয়ের ওপর ক্রমান্বয়ে উচ্চ হারে কর ধার্য হয়। এটি একটি প্রগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন সিস্টেম যেখানে অধিক আয়ের ওপর অধিক হারে কর নির্ধারিত হয়:
| আয়ের স্তর (স্লাব) | প্রযোজ্য কর হার | সর্বোচ্চ করের পরিমাণ (টাকা) |
|---|---|---|
| প্রথম করমুক্ত সীমা পর্যন্ত আয়ের ওপর (৪,০০,০০০/৪,৫০,০০০ ৳) | ০% (করমুক্ত) | ০ টাকা |
| পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর | ৫% | ৫,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর | ১০% | ৪০,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর | ১৫% | ৭৫,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর | ২০% | ১,০০,০০০ টাকা |
| অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর (১৬.৫০ লাখ টাকার পর) | ২৫% | আয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল |
(সারণীটি ডানে-বামে স্ক্রল করে সম্পূর্ণ তথ্য দেখুন)
৩. এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর (Minimum Tax) পরিশোধের আইনি বিধান
আয়কর আইন ২০২৩ এর বিধান অনুযায়ী কোনো করদাতার মোট করযোগ্য আয় যদি তার জন্য নির্ধারিত করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে, তবে তাকে তার ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত ন্যূনতম কর অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ রেয়াত বা কর গণনার পর করদায় ন্যূনতম করের চেয়ে কম হলেও ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হবে:
- •ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা: ৫,০০০ টাকা।
- •অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন (যেমন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা) এলাকা: ৪,০০০ টাকা।
- •সিটি কর্পোরেশন বহির্ভূত জেলা সদর, পৌরসভা ও অন্যান্য সকল গ্রামীণ এলাকা: ৩,০০০ টাকা।
- •বিশেষ প্রণোদনা: নতুন নিবন্ধিত করদাতা যিনি জীবনে প্রথমবার রিটার্ন দাখিল করছেন, তার জন্য ন্যূনতম কর মাত্র ১,০০০ টাকা।
৪. বাস্তব উদাহরণ: বার্ষিক ৭ লাখ টাকা আয়ে কর পরিগণনা
ধরা যাক, একজন পুরুষ করদাতার বার্ষিক করযোগ্য আয় ৭,০০,০০০ টাকা এবং তিনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বসবাস করেন। তার কর হিসাব হবে নিম্নরূপ:
১. প্রথম ৪,০০,০০০ টাকার ওপর (০%): ০ টাকা
২. পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকার ওপর (৫%): ৫,০০০ টাকা
৩. পরবর্তী ২,০০,০০০ টাকার ওপর (১০%): ২০,০০০ টাকা
মোট গ্রস প্রদেয় কর = ৫,০০০ + ২০,০০০ = ২৫,০০০ টাকা। যদি তিনি অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করে রেয়াত পান, তবে রেয়াত বাদে অবশিষ্ট কর দিতে হবে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর ও আইনি সমাধান (FAQ)
প্রশ্ন: আমার বার্ষিক মোট আয় ৪,২০,০০০ টাকা হলে কত কর দিতে হবে?
উত্তর: প্রথম ৪,০০,০০০ টাকা করমুক্ত। অবশিষ্ট ২০,০০০ টাকার ওপর ৫% হারে কর হয় ১,০০০ টাকা। তবে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বসবাস করলে আইন অনুযায়ী ন্যূনতম কর ৫,০০০ টাকা দিতে হবে (যদি আপনি প্রথমবার দাখিলকারী নতুন করদাতা না হন)।
প্রশ্ন: মহিলা করদাতা কি প্রথমবার দাখিলে ১০০০ টাকা ন্যূনতম কর দিতে পারবেন?
উত্তর: হ্যাঁ, নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো করদাতা যিনি জীবনে প্রথমবার ই-টিন খুলে রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, তিনি এলাকা নির্বিশেষে মাত্র ১,০০০ টাকা ন্যূনতম কর দিয়ে রিটার্ন সাবমিট করতে পারবেন।
প্রশ্ন: আমার আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে কি রিটার্ন জমা দিতে হবে?
উত্তর: যদি আপনার কোনো ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র থাকে, ক্রেডিট কার্ড থাকে বা ধারা ২৬৪-এর ৪৬টি বাধ্যতামূলক সেবার আওতাভুক্ত হন, তবে আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলেও শূন্য কর (Zero Tax) রিটার্ন জমা দিতে হবে।
উপসংহার ও কর পরামর্শ
সঠিক কর স্লাব জেনে আয়কর গণনা করা এবং যথাসময়ে ই-রিটার্ন দাখিল করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। এতে জরিমানার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং ব্যাংকিং ও সরকারি ৪৬টি সেবা সহজে গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
এই আর্টিকেলের সমস্ত তথ্য, কর হার, সীমা এবং আইনি ব্যাখ্যা বাংলাদেশ আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর অফিশিয়াল প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্রের আলোকে সংকলিত।
আপনার সঠিক আয়কর ও বিনিয়োগ রেয়াত হিসাব করতে চান?
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ক্যালকুলেটরে এক ক্লিকে সম্পূর্ণ নির্ভুল হিসাব দেখুন।
সম্পর্কিত আর্টিকেল ও প্রামাণ্য গাইড
আয়কর আইন ২০২৩ ও রাজস্ব অধ্যাদেশের আলোকে প্রাসঙ্গিক নির্দেশিকাসমূহ